Hostever

ওয়েবসাইট বানাতে গেলে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসে — হোস্টিং কোথায় নেবো? বাংলাদেশে অনেক হোস্টিং কোম্পানি আছে, কিন্তু সবার সেবার মান এক নয়। কেউ সস্তায় দেয় কিন্তু সার্ভার বারবার ডাউন হয়, কেউবা দাম বেশি নেয় কিন্তু সাপোর্ট পাওয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে Hostever বেশ পরিচিত একটি নাম। ২০১১ সালে “Code For Host” নামে শুরু হওয়া এই কোম্পানিটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় হোস্টিং সেবাদাতা। তাদের বিশেষত্ব হলো BDIX সংযুক্ত হোস্টিং — যেটা বাংলাদেশের ভিজিটরদের জন্য ওয়েবসাইটকে অনেক দ্রুত করে তোলে।

Hostever কী এবং কোথায় অবস্থিত?

Hostever বাংলাদেশভিত্তিক একটি ওয়েব হোস্টিং কোম্পানি। তাদের অফিস টাঙ্গাইলের সাখিপুরে। তবে তাদের ডেটাসেন্টার শুধু বাংলাদেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও ভারতেও আছে।

বাংলাদেশি গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে তারা বাংলাদেশি টাকায় (BDT) পেমেন্ট নেয় এবং bKash, Rocket, Nagad-সহ সব প্রধান মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে পেমেন্টের সুবিধা দেয়। এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় সুবিধা।

Hostever কী কী সেবা দেয়?

শেয়ার্ড হোস্টিং (Linux): ব্যক্তিগত ব্লগ, পোর্টফোলিও বা ছোট ব্যবসার ওয়েবসাইটের জন্য। সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প। SSD স্টোরেজ, LiteSpeed সার্ভার, বিনামূল্যে SSL সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। শুরু হয় বার্ষিক মাত্র ১,৫০০ টাকা থেকে।

BDIX হোস্টিং: এটি Hostever-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় সেবা। বাংলাদেশের ৩,৫০০-এরও বেশি ইন্টারনেট সেবাদাতার সঙ্গে সংযুক্ত BDIX নেটওয়ার্কে হোস্ট করা হয়। ফলে বাংলাদেশি ভিজিটরদের জন্য সাইট লোড হওয়ার সময় মাত্র ১-৬ মিলিসেকেন্ড — আন্তর্জাতিক সার্ভারে যেখানে ৩০০-৪০০ মিলিসেকেন্ড লাগে। BDIX হোস্টিং শুরু হয় বার্ষিক ১,৮০০ টাকা থেকে।

Windows হোস্টিং: যারা ASP.NET বা .NET Core-ভিত্তিক ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশন চালাতে চান তাদের জন্য। Windows Server Datacenter ব্যবহার করা হয়। বিশেষত যারা Microsoft প্রযুক্তিতে কাজ করেন তাদের জন্য উপযুক্ত।

VPS হোস্টিং (Managed ও Unmanaged): নিজের মতো করে সার্ভার কনফিগার করার সুবিধা। KVM ভার্চুয়ালাইজেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। Unmanaged VPS শুরু হয় মাসে ১,০০০ টাকা থেকে। Managed VPS শুরু হয় মাসে ৪,২৭৫ টাকা থেকে। VPS-এ সম্পূর্ণ root access পাওয়া যায়।

ডেডিকেটেড সার্ভার: বড় ওয়েবসাইট বা উচ্চ ট্র্যাফিকের অ্যাপ্লিকেশনের জন্য। পুরো সার্ভার শুধু আপনার। BDIX ডেডিকেটেড সার্ভার শুরু হয় মাসে ৮,৮০০ টাকা থেকে।

ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন: .com, .net, .org, .info-সহ সব জনপ্রিয় ডোমেইন এক্সটেনশন পাওয়া যায়। অনেক হোস্টিং প্যাকেজে প্রথম বছর বিনামূল্যে ডোমেইন দেওয়া হয়।

SSL সার্টিফিকেট: বেশিরভাগ প্যাকেজে Lifetime বিনামূল্যে SSL দেওয়া হয়। আলাদাভাবেও COMODO SSL কেনা যায় — বার্ষিক $১২ থেকে $১৫৬ পর্যন্ত।

ব্যবসায়িক ইমেইল হোস্টিং: নিজের ডোমেইনে পেশাদার ইমেইল সেবা।

BDIX হোস্টিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই বিষয়টা বাংলাদেশের অনেক ওয়েবসাইট মালিক ভালোভাবে বোঝেন না, তাই একটু বিস্তারিত বলা দরকার।

বাংলাদেশে যখন কেউ কোনো ওয়েবসাইট দেখে, সেই অনুরোধ সাধারণত আন্তর্জাতিক সার্ভারের মাধ্যমে যায়। এতে সময় বেশি লাগে। কিন্তু BDIX নেটওয়ার্কে হোস্ট করা ওয়েবসাইট বাংলাদেশের মধ্যেই থাকে — তাই লোডিং সময় অনেক কমে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ওয়েবসাইট লোড হতে ২.৫ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগলে ৩৮ ভাগ ভিজিটর চলে যান। BDIX হোস্টিং এই সমস্যার সমাধান করে। তাছাড়া Google পেজ স্পিডকে র‍্যাংকিং ফ্যাক্টর হিসেবে ব্যবহার করে — তাই দ্রুত সাইট মানে ভালো SEO।

বাস্তব উদাহরণ

ধরুন ঢাকার একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভারে হোস্ট করা আছে। বাংলাদেশ থেকে কেউ পেজ খুললে লোড হতে ৩-৪ সেকেন্ড লাগছে। অনেক পাঠক অপেক্ষা না করে চলে যাচ্ছে।

সেই পোর্টাল Hostever-এর BDIX হোস্টিংয়ে মাইগ্রেট করলে লোড টাইম ০.৫-১ সেকেন্ডে নেমে আসবে। পাঠক ধরে রাখা সহজ হবে, Google-এ র‍্যাংকিংও উন্নত হবে।

মূল্য ও পরিকল্পনা

শেয়ার্ড হোস্টিং (Linux) বেসিক প্ল্যান বার্ষিক ১,৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। এতে ৫ GB স্টোরেজ, ১০০ GB ব্যান্ডউইথ এবং ১টি ডোমেইন হোস্ট করা যায়। তবে ব্যাকআপ সেবা পেতে হলে অ্যাডভান্স প্যাকেজ নিতে হবে।

BDIX শেয়ার্ড হোস্টিং বার্ষিক ১,৮০০ টাকা থেকে শুরু। বাংলাদেশের ভিজিটরদের জন্য সেরা গতি। নিউজ পোর্টাল, ই-কমার্স ও ব্লগের জন্য উপযুক্ত।

VPS হোস্টিং Unmanaged: মাসে ১,০০০ টাকা থেকে। Managed: মাসে ৪,২৭৫ টাকা থেকে। সার্ভার ব্যবস্থাপনার জ্ঞান না থাকলে Managed নেওয়াই ভালো।

ডেডিকেটেড সার্ভার মাসে ৮,৮০০ টাকা থেকে শুরু। বড় ট্র্যাফিকের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনের জন্য।

সব পরিকল্পনায় ৩০ দিনের অর্থফেরত গ্যারান্টি আছে। পেমেন্ট মাসিক, ৩ মাস, ৬ মাস, বার্ষিক, ২ বছর বা ৩ বছরে করা যায়।

Hostever-এর বিশেষ সুবিধাগুলো

LiteSpeed ওয়েব সার্ভার: সাধারণ Apache সার্ভারের তুলনায় অনেক দ্রুত। WordPress সাইটের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর।

CloudLinux OS: প্রতিটি হোস্টিং অ্যাকাউন্টকে আলাদাভাবে সুরক্ষিত রাখে। এক ব্যবহারকারীর সমস্যা অন্যের সাইটকে প্রভাবিত করতে পারে না।

৭ দিনের ব্যাকআপ: অ্যাডভান্স প্যাকেজগুলোতে তিন স্তরের দৈনিক ব্যাকআপ সুবিধা পাওয়া যায়। গত ৭ দিনের যেকোনো দিনের ডেটা ফিরিয়ে আনা যাবে।

cPanel নিয়ন্ত্রণ প্যানেল: বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় হোস্টিং কন্ট্রোল প্যানেল। সহজেই ফাইল, ডেটাবেজ, ইমেইল পরিচালনা করা যায়।

Softaculous: এক ক্লিকে WordPress, Joomla, Drupal-সহ ৪৫০-এরও বেশি অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টল করা যায়।

২৪/৭ সাপোর্ট: ফোন, লাইভ চ্যাট, ইমেইল ও সাপোর্ট টিকেটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সাহায্য পাওয়া যায়। AnyDesk-এর মাধ্যমে দূর থেকেও সাহায্য করা হয়।

Anti-DDoS সুরক্ষা: সাইবার আক্রমণ থেকে ওয়েবসাইট সুরক্ষিত রাখে।

সুবিধা ও অসুবিধা

যা ভালো:

  • বাংলাদেশি পেমেন্ট পদ্ধতি — bKash, Rocket, Nagad সব চলে
  • BDT-তে দাম, আন্তর্জাতিক কার্ড ছাড়াও কেনা যায়
  • BDIX হোস্টিং বাংলাদেশি সাইটের জন্য অনেক দ্রুত
  • LiteSpeed ও NVMe SSD দিয়ে উন্নত পারফরম্যান্স
  • ২৪/৭ ফোন ও লাইভ চ্যাট সাপোর্ট
  • ৩০ দিনের অর্থফেরত গ্যারান্টি
  • বিনামূল্যে Lifetime SSL
  • ৯৯.৯৯% আপটাইম গ্যারান্টি
  • WHTop-এ ৫৬ রিভিউতে ৯.৮/১০ রেটিং

যা একটু কম ভালো:

  • বেসিক প্যাকেজে ব্যাকআপ সুবিধা নেই
  • Managed VPS-এর দাম তুলনামূলক বেশি
  • আন্তর্জাতিক হোস্টিং কোম্পানির মতো ব্যাপক ডকুমেন্টেশন নেই
  • কিছু পুরনো প্যাকেজে HDD স্টোরেজ থাকতে পারে

কার জন্য Hostever উপযুক্ত?

নতুন ব্লগার ও উদ্যোক্তা: যারা প্রথমবার ওয়েবসাইট বানাচ্ছেন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বাংলাদেশি সাপোর্ট চান।

ছোট ব্যবসার মালিক: যাদের বাংলাদেশি ভিজিটর বেশি এবং সাইটের দ্রুত লোড হওয়া দরকার।

নিউজ পোর্টাল ও ই-কমার্স: যাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের ট্র্যাফিক বেশি এবং BDIX গতি প্রয়োজন।

ডেভেলপার ও ফ্রিল্যান্সার: যারা ক্লায়েন্টের সাইট হোস্ট করেন এবং স্থানীয় পেমেন্ট পদ্ধতি চান।

তবে যদি আপনার ওয়েবসাইটের ভিজিটর মূলত বিদেশি হন, তাহলে Hostinger বা SiteGround-এর মতো আন্তর্জাতিক হোস্টিং বেশি উপযুক্ত হতে পারে।

Hostever বনাম অন্য বাংলাদেশি হোস্টিং

বাংলাদেশে আরও অনেক হোস্টিং কোম্পানি আছে — ExonHost, DianaHost, IT Nut Hosting। তাদের তুলনায় Hostever-এর বিশেষত্ব হলো BDIX সংযোগের মান, LiteSpeed সার্ভার প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক ফোন সাপোর্ট। অনেক ব্যবহারকারী বলেন রাত ২টায়ও ফোন করলে কেউ না কেউ ধরেন — এটা বাংলাদেশে বিরল।

শেষ কথা

Hostever বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ভালো হোস্টিং বিকল্প — বিশেষত যাদের দর্শক মূলত দেশের মধ্যে। সাশ্রয়ী মূল্য, বাংলাদেশি পেমেন্ট পদ্ধতি এবং BDIX-এর দ্রুত গতি মিলিয়ে এটি দেশীয় ওয়েবসাইটের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পছন্দ।

যদি নতুন ওয়েবসাইট শুরু করতে চান, তাহলে BDIX অ্যাডভান্স প্যাকেজ দিয়ে শুরু করুন — ব্যাকআপ সুবিধাসহ। আর যদি ট্র্যাফিক বাড়লে VPS-এ যেতে হবে — সেক্ষেত্রে Managed VPS নেওয়াই নিরাপদ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: Hostever কি বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য হোস্টিং কোম্পানি? উত্তর: হ্যাঁ, WHTop-এ ৫৬ জন ব্যবহারকারীর রিভিউতে Hostever ৯.৮/১০ রেটিং পেয়েছে। ৫৫ জন সুপারিশ করেছেন। ২০১১ সাল থেকে চলে আসা এই কোম্পানি বাংলাদেশে বেশ পরিচিত।

প্রশ্ন: BDIX হোস্টিং কি সত্যিই দ্রুত? উত্তর: হ্যাঁ। সাধারণ আন্তর্জাতিক সার্ভারে বাংলাদেশ থেকে ping ৩০০-৪০০ মিলিসেকেন্ড। BDIX হোস্টিংয়ে এটি মাত্র ১-৬ মিলিসেকেন্ড — প্রায় ২০০ গুণ দ্রুত। বাংলাদেশি ভিজিটরদের জন্য সাইট অনেক দ্রুত লোড হয়।

প্রশ্ন: Hostever-এ কীভাবে পেমেন্ট করা যায়? উত্তর: bKash, Rocket, Nagad, Tap Pay, DBBL Nexus-সহ সব প্রধান মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চলে। এছাড়া Visa ও MasterCard ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড এবং ব্যাংক ট্রান্সফারেও পেমেন্ট করা যায়।

প্রশ্ন: Hostever-এ WordPress ইনস্টল করা কি সহজ? উত্তর: হ্যাঁ, Softaculous-এর মাধ্যমে এক ক্লিকেই WordPress ইনস্টল করা যায়। আলাদা কোনো প্রযুক্তিগত জ্ঞান লাগে না।

প্রশ্ন: Hostever-এর সাপোর্ট কি ভালো? উত্তর: ২৪/৭ ফোন, লাইভ চ্যাট ও টিকেট সাপোর্ট পাওয়া যায়। AnyDesk দিয়ে দূর থেকে সমস্যা সমাধানের সুবিধাও আছে। বেশিরভাগ ব্যবহারকারী সাপোর্টকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন।

প্রশ্ন: Hostever-এ ডেটা ব্যাকআপ কীভাবে কাজ করে? উত্তর: অ্যাডভান্স প্যাকেজগুলোতে তিন স্তরের দৈনিক ব্যাকআপ সুবিধা আছে। গত ৭ দিনের যেকোনো দিনের ডেটা পুনরুদ্ধার করা যায়। বেসিক প্যাকেজে ব্যাকআপ নেই, তাই প্রফেশনাল সাইটের জন্য অ্যাডভান্স প্যাকেজ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: Hostever-এ কি অর্থফেরত গ্যারান্টি আছে? উত্তর: হ্যাঁ, সব প্ল্যানে ৩০ দিনের অর্থফেরত গ্যারান্টি আছে। পছন্দ না হলে ৩০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে।